রবীন্দ্রনাথঃ বেঁচে থাকার মন্ত্রসাধক
যতীন সরকার
‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ‘বেঁচে’ ছিলেন’-এই বাক্যটি পড়তে গিয়ে মনের ভেতর একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলাম। সব মানুষই তো সারা জীবন বেঁচে থাকে। আমরা জানি যে যার জীবন আছে সেই বেঁচে আছে। জীবন আছে অথচ বেঁচে নেই-এমন কোন মানুষের কথা কি আমরা ভাবতে পারি কখনো? তাহলে, ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ‘বেঁচে’ ছিলেন’-এ-রকম কথার অর্থ কী দাঁড়ায়?
কথাটা লিখেছিলেন প্রয়াত মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ‘রবীন্দ্রমানস বিশ্লেষণের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। পুরো প্রবন্ধটি পড়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম যে বেঁচে থাকা সম্পর্কে আমাদের চলতি ধারণাটা মোটেই সঠিক নয়। আসলে কোনো রকমে জীবন ধারণ করে থাকাটাই বেঁচে থাকা নয়। বেঁচে থাকা মানে প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠতে থাকা, নব নব সৃষ্টিশীলতার মধ্যে দিয়ে জীবনকে সার্থক করে তুলতে থাকা, পুরনো পশ্চাৎপদ ভাবনার বৃত্ত ভেঙে কেবলই সামনে এগিয়ে যেতে থাকা, প্রতি মুহূর্তে নবীন তাজা বর্ধিষ্ণু হয়ে উঠতে থাকা, সর্বদা বুকের ভিতর মাঝে বিশ্বলোকের সাড়া অনুভব করতে থাকা, ব্যক্তিক স্বার্থের ক্ষুদ্র গণ্ডি অতিক্রম করে বৈশ্বিক ও সর্বমানবিক স্বার্থের মহাসমুদ্রের দিকে জীবন প্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকা। এর বিপরীত অবস্থাতেও মানুষ জীবন ধারণ করতে পারে নিশ্চয়ই, অনেক মানুষ তেমনটি করেও, এবং এ-রকম মানুষ দীর্ঘজীবীও হয়। কিন্তু দীর্ঘজীবী হয়েও সে-মানুষ বেঁচে থাকে না, প্রাণ ধারণ করে থাকে মাত্র। শুধু দিন যাপনের, শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি বহন করে চলে কেবল। সে রকম মানুষ দীর্ঘজীবী হয়েও সারা জীবন কেবল মরতে থাকে। গতিশীলতাই বেঁচে থাকার লক্ষণ, গতিহীনতাই মরে যাওয়ার। শুধু গতিহীনতাই নয়, পশ্চাৎগতিরও অপর নাম মরণই। যে মানুষ চিন্তায় চেতনায় কর্মে আচরণে প্রতিনিয়ত রক্ষণশীলতাকেই আঁকড়ে ধরে থাকে, প্রগতিশীলতা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, অভ্যস্ততার গণ্ডি অতিক্রম করে যেতে ভয় পায়, সে-মানুষ জীবিত থেকেও মৃত।
এ-রকম জীবন্মৃত মানুষদের বিপরীতে ছিল রবীন্দ্রনাথের অবস্থান। জীবনের ঊষালগ্নে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ হওয়ার পর থেকে সামনের দিকে যে পথচলা শুরু করেছিলেন তিনি, জীবনমঞ্চ থেকে বিদায় নেবার পূর্ব অবধি তাঁর সেই সম্মুখ গতির বিরাম ঘটে নি, এক মুহূর্তের জন্যও পেছনে ফেরেন নি। এবং এ কারণেই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে যে অন্য অন্য মানুষের মতো রবীন্দ্রনাথ শুধু জীবনধারণ করেন নি, তিনি সারা জীবন বেঁচে ছিলেন।’
মনোবিজ্ঞানী ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় পাভলভীয় মনোবিজ্ঞানের সূত্র গ্রয়োগ করে রবীন্দ্র মানসে বিচ্ছিন্নতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন, রবীন্দ্র-চিত্রকলার স্বরূপ নির্ণয় করেছেন, ‘সোনার তরী’ কবিতাটির বিশিষ্ট তাৎপর্য উদ্ঘাটন করেছেন, রবীন্দ্র-চিত্রকলার স্বরূপ নির্ণয় করেছেন। সে-সব বিষয় আমার আলোচ্য নয়। ধীরেন্দ্রনাথ যা বলেন নি, এবং রবীন্দ্রনাথের সারা জীবন বেঁচে থাকার বিষয়টি আমার নিজের উপলব্ধিতে যে ভাবে ধরা পড়েছে, আমি কেবল তারই সংক্ষিপ্ত বয়ান এখানে উপস্থাপন করতে চাই।
দুই
‘মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান’Ñএকেবারে বালক বয়সে এমন কথা বলেন যে-কবি, কৈশোরোত্তীর্ণ সেই কবির কণ্ঠেই শোনা যায়Ñ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ তবে মরতে নাÑচাইলেই যে না-মরে থাকা যায় না, সে কথা নিশ্চয়ই তাঁর অবিদিত ছিল না। কিন্তু মরবার আগে বারবার না মরে কি করে বেঁচে থাকা যায়, সে মন্ত্রও তাঁর জানা ছিল। সেই মন্ত্রের সাধনাই তিনি করেছেন সারা জীবন, সেই মন্ত্রই তাঁকে অব্যাহতভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাঁর সমস্ত সৃষ্টি জুড়েই সেই মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে।
যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে
সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে;
যে- জাতি জীবনহারা অচল অসাড়
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।’
Ñ‘চৈতালি’র এই ‘দুই উপমা’ কবিতাতে রবীন্দ্রনাথ জাতির জীবনে যা প্রত্যক্ষ করেছেন, প্রতিটি ব্যক্তির জীবনেও তা সমভাবেই সত্য। আপন ব্যক্তি-জীবনে সেই সত্য সম্পর্কে সদা সচেতন ছিলেন বলেই তিনি কখনো ‘অচল অসাড়’ হয়ে যান নি, চিন্তায় ও আচরণে ‘জীর্ণ লোকাচারের’ বাঁধনে বাঁধা পড়েন নি।
এমন কি, তাঁর ঈশ্বর অনুধাবনা ও ঈশ্বর-সাধনা সম্পর্কেও এই একই কথা প্রযোজ্য। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তার প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার নিয়েই তিনি ব্রাহ্ম হয়েছিলেন, এবং আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের দায়িত্বও পরম যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের ঈশ্বর-ভাবনাতেও যে একটি যান্ত্রিকতা বিদ্যমান, সেই যান্ত্রিকতার বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকলে যে জীবন অচল অসাড় হয়ে যাবে, সে বোধে উপনীত হতেও তাঁর বেশি সময় লাগে নি। ‘নৈবেদ্য’র কবিতাগুলিতে তাঁর যে ঈশ্বর-ভাবনার প্রকাশ দেখি, ‘গীতালি-গীতিমাল্য-গীতাঞ্জলি’র ঈশ্বর ভাবনা তা থেকে স্পষ্টতই পৃথক। ‘নৈবেদ্য’ কাব্যে এক অতিবর্তী ঈশ্বরের প্রতি নৈবেদ্য অর্পণ করেছেন যে-কবি, ‘গীতাঞ্জলি’তে কিন্তু সেই কবিই দেবালয়ে বা মন্দিরে বসে ঈশ্বরের ‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা’ করাকে ধিক্কার জানিয়ে ঈশ্বর-সন্ধান করেছেন সেই স্থানে ‘যেথায় মাটি ভেঙে করছে চাষা চাষ, পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ, খাটছে বারোমাস’।
‘গীতাঞ্জলি’র মাধ্যমে অসাধারণ বিশ্বস্বীকৃতি লাভের পরও কবি এক আসনে বসে থেকে খ্যাতির চর্বিত চর্বণের মধ্যেই সুখের সন্ধান করেন নি, ‘পাগলামি তুই আয়রে দুয়ার ভেদি’ বলে ‘ঝড়ের খেয়া’য় চড়ে বসেছেন। ‘বলাকা’র কবির মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদককে খুঁজে পাওয়া তো অসম্ভবই, ‘গীতাঞ্জলি’র কবির থেকেও তখন তিনি দুস্তর ব্যবধানে চলে এসেছেন। শুধু ‘কবি’ রবীন্দ্রনাথ নন, এক অসাধারণ প্রতিবাদী ‘ব্যক্তি’ রবীন্দ্রনাথকেও আমরা এ-যুগেই প্রত্যক্ষ করি। শাসকশ্রেণীর অন্যায়ের প্রতিবাদে এ-যুগেই তিনি শাসকদের দেয়া ‘ছার’ [স্যার] উপাধি পরিত্যাগ করে একাত্ম হয়ে যান অত্যাচারিত শাসিতদের সঙ্গে। প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই স্থাপন করেন বাঁচার মতো বাঁচার দৃষ্টান্ত।
তাঁর প্রতিবাদ অবিশ্যি কোনোদিনই একান্ত স্থূল ও উগ্র হয়ে ওঠেনি। তাই তিনি কারো কাছেই প্রতিবাদী কবি বলে প্রতিভাত হন না। কিন্তু অভিনিবেশ সহকারে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার অনুধাবন করলে দেখা যাবে যে ‘ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর’-জীবন প্রভাতে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ-জাত এই আত্মপ্রেরণাই তাঁকে সারা জীবন প্রতিবাদী করে রেখেছে। এই আত্মপ্রেরণাতেই তিনি প্রতিনিয়ত প্রতিবাদের বাণী সৃজন করেছেন ও ভাঙার গান গেয়েছেন। তবে কবিসার্বভৌমের সেই বাণী ও গান অসাধারণ শিল্পিত বলেই তাঁর প্রতিবাদ আর প্রতিবাদ থাকে না, পরিণত হয় জীবনের আনন্দময় সংবাদে; ভাঙার গানে ধ্বনিত হয় সৃজনের সুর ও সার্থকভাবে বেঁচে থাকার মন্ত্র।
তিন
পৃথিবীতে একলা মানুষ কখনো বেঁচে থাকে না, অন্য মানুষের সঙ্গে যোগযুক্ত হয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, সমষ্টির বেঁচে থাকা থেকে কোনো মতেই ব্যষ্টির বা ব্যক্তির বেঁচে থাকাকে আলাদা করে ফেলা যায় না। অথচ, সমাজ যখন থেকে শ্রেণীবিভক্ত হয়েছে তখন থেকেই সংখ্যায় লঘিষ্ট কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে যে কর্তৃত্বশীল শ্রেণী, সেই শ্রেণীর মানুষেরা নিজেদের বেঁচে থাকাকে নিশ্চিত করতে চায় অন্য সকলের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করে। এ-রকম একটি সমাজে জন্ম নিয়েও আমাদের কবির আকাক্সক্ষাÑ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। কিন্তু তাঁর চারপাশে তাকিয়ে দেখেন যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানবই এখানে মানবের মতো বেঁচে নেই, তারা শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোনো মতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণ রেখে দেয় বাঁচাইয়া’। কবি খুব ভাল করেই জানেন যে এ-রকম ভাবে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চাই অনেকগুলো উপকরণ। সেই উপকরণগুলোর কথাই তিনি মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করেন,Ñ ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্তবায়ু / চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ -উজ্জ্বল পরমায়ু,/ সাহস বিস্তৃত বক্ষপট।’
কিন্তু এই সব চাওয়া তো বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনেই পাওয়ায় পরিণত হয় না। তাই তারা কেউই সারা জীবন বেঁচে থাকতে পারে না। ‘সারা জীবন’ কেন, জীবনের কোনো পর্যায়েই কি তারা বেঁচে থাকে? বেঁচে থাকার প্রাথমিক উপকরণের অভাবেই তারা দৈন্যদশা গ্রস্ত, এবং এ-রকম দৈন্যদশাই সর্বদা তাদের দুর্ভাবনায় ভাবিত করে রাখে। এমন দৈন্য ও দুর্ভাবনাময় জীবন আসলে মরণেরই নামান্তর। সেই মরণকে প্রতিহত করার দায়িত্ববোধ থেকেই কবি নিজেকেই ডাক দিয়ে বলেন,Ñ‘কবি তবে উঠে এস যদি থাকে প্রাণ/ তবে তাই লহ সাথে, তাই করো আজি দান।’
সমষ্টির জীবনকে অর্থময় করে তোলার জন্যÑসমাজের দৈন্যদশাগ্রস্ত মানুষগুলোর বেঁচে থাকার পথ খুলে দেয়ার জন্য যাঁরা নিজেদের প্রাণ দান করেছেন তাঁরা হয়েছেন মৃত্যুঞ্জয়। অর্থাৎ জীবনে তো বটেই, মরণের পরও তাঁরা বেঁচে আছেন ও থাকবেন। তাই তাঁদের সম্পর্কে কবির নির্দ্বিধ উচ্চারণÑ‘নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান / ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’
এইভাবেই রবীন্দ্রনাথ নিজে যেমন থেকেছেন, তেমনই অন্য সকলকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছেন, এবং মরণজয়ী মানুষদের জন্য শ্রদ্ধার ডালি বহন করে এনেছেন।
চার
গড়পড়তা প্রায় সব মানুষেরই একটা বিশেষ বয়সের পর দেহের বৃদ্ধি যেমন রুদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি হয় মনেরও। কারো কারো মন তো একেবারে পেছনের দিকেই হাঁটতে থাকে। চিন্তায় গতিহীনতা দেখা দেয়, অথবা প্রগতির বদলে প্রতিক্রিয়াশীলতা কিংবা রক্ষণশীলতাকে আশ্রয় করে। অর্থাৎ জীবিত থেকেও বেঁচে থাকার বদলে এরা মরণ প্রক্রিয়ার অধীন হয়ে যায়। এমনটি যে শুধু নিতান্ত সাধারণ মানুষের বেলাতেই ঘটে, তা নয়। অনেক প্রথিতযশা শিল্পী চিন্তাবিদের পক্ষেও এ-রকম পরিণতি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। মনে হয় এ-রকমটিই যেন সাধারণ নিয়ম।
সেই নিয়মেরই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ। বয়সে যত তিনি বার্ধক্যের দিকে এগিয়েছেন ও শরীরে জরার অধিকার বিস্তৃত হয়েছে, তাঁর মন তত যৌবনদৃপ্ত ও জরামুক্ত হয়ে উঠেছে। সাতষট্টি বছর যখন তাঁর বয়স, সেই ১৯২৮ সনে, ‘মহুয়া’ কাব্যের অসাধারণ প্রেমের কবিতাগুলি তিনি রচনা করলেন। গতানুগতিক ধারায় যাঁরা চিন্তা করতে অভ্যস্ত, তাঁরা বৃদ্ধ কবির কলমে এমন ‘যৌবন বেদনারসে উচ্ছল’ প্রেমের কবিতার উৎসারণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারলেন না। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন,Ñ‘আযৌবন কবি প্রেমের কবিতা লিখিতেছেনÑকতভাবে কত রীতিতে তাহার প্রকাশ। আজ কবির সাতষট্টি বৎসর বয়সে জরাশ্রিত দেহের মধ্যে যে-মনের বাস তাহা প্রেম-কাকলীতে আকস্মিক ভাবে মুখর হইয়া উঠিল। এই কবিতা গুচ্ছ তাঁহার পাঠকসমাজকে অত্যন্ত বিব্রত করে ; যাঁহারা রবীন্দ্রনাথকে কেবল ভক্তসাধক রূপেই কল্পনা করিতে ভালবাসেন, তাঁহারা কবির লেখনী হইতে এই বৃদ্ধ বয়সে এই শ্রেণীর কবিতা প্রত্যাশা করেন নাই।’
তাঁরা তো তা প্রত্যাশা করবেনই না। তাঁদের দৃষ্টিতে বার্ধক্য মানেই ‘শেষের সেদিন ভয়ংকরের’ কথা ভাবতে ভাবতে পরলোক স্বর্গলাভের আশায় ভগবানের শ্রীচরণে ভক্তিনিবেদন মাত্র! কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো এমন স্বর্র্গাভিলাষী ভক্তসাধক নন। অনেক পূর্বেই তিনি ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ নিয়ে এসে মর্ত্যরে মৃত্তিকায় প্রেমিক রূপে অবস্থান গ্রহণ করে নতুন ভাবদ্যোতনায় বেঁচে উঠেছেন, দেহের জরা বা বার্ধক্য তাঁর সেই চিরজীবী ও চিরযুবা প্রেমিক মনকে একটুও স্পর্শ করতে পারে না। তাই শুধু ‘মহুয়া’র প্রেমের কবিতাগুচ্ছই নয়,-এসময়েই তিনি রচনা করেন একেবারে আধুনিকতম প্রেমের উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’। এরও পরে বায়াত্তর বছর বয়সে ১৯৩৩-এ প্রকাশ করেন ‘দুইবোন’ ও ১৯৩৪-এ তেয়াত্তর বছর বয়সে ‘মালঞ্চ’। দুটোই প্রেমের উপন্যাস। নতুন কালে নরনারীর প্রেমভাবনাতেও যে যুগান্তর ঘটে গেছে, সেই বিষয়টি যে-রকম গভীরতা ও সূক্ষ্মতার সঙ্গে অনুভব করলেন সত্তরোর্ধ বয়সের রবীন্দ্রনাথ, সে-রকমটি করা কোন তরুণ বয়সী কবি বা কথাশিল্পীর পক্ষেও সম্ভব হয় নি। এখানেই তো রবীন্দ্রনাথের অনন্যতা, প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার প্রমাণ।
শুধু প্রেমভাবনাতেই নয়, সমাজচেতনা ও ইতিহাস-বীক্ষার জগতেও রবীন্দ্রনাথ প্রগতিশীলতার ধারক হয়েই বেঁচে থেকেছেন। এক্ষেত্রেও তাঁর বয়স যত বেড়েছে, ততই তিনি রক্ষণশীলতা থেকে দূরে সরে এসে নবীনতর ও অগ্রসর মতাদর্শের সমর্থক হয়ে উঠেছেন। তাই দেখি: যে-রবীন্দ্রনাথ এক সময় রুশ বলশেভিকদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি ছিলেন একান্ত বিমুখ, ১৯২৬ সালেও যিনি ‘ফ্যাসিজম’ ও ‘বলশেভিজম্’কে একই দৃষ্টিতে দেখে এই দুয়ের মধ্যেই ‘গুণ্ডাতন্ত্রের আখড়া’র খোঁজ পেয়েছিলেন ও বলেছিলেন ‘রাশিয়ার জারতন্ত্র ও বলশেভিকতন্ত্র একই দানবের পাশমোড়া দেওয়া,’ সেই রবীন্দ্রনাথই এর মাত্র চার বছর পরে ১৯৩০ সনে সোভিয়েত রাশিয়া পরিভ্রমণ করে উপলব্ধি করলেন যে এ-দেশটি ‘অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা জাগিয়ে তুলছে।’ শুধু তাই নয়। তাঁর অনুভবে এল যে রাশিয়ায় ‘না এলে এ-জন্মের তীর্থ দর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।’
প্রতিনিয়ত বাঁচার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ না-থাকলে অনুভবের এ-রকম প্রগতিমুখী রূপান্তর কারো ভেতর ঘটতে পারে না। অবিরাম রূপ থেকে রূপান্তরের পথে হেঁটে হেঁটেই তো রবীন্দ্রনাথের সারা জীবন বেঁচে থাকা।
তাঁর ঈশ্বর-ভাবনাতেও ক্রমরূপান্তর ঘটতে আমরা দেখেছি। জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে তিনি যে-সব সৃষ্টি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন, সে-সবের মধ্যে ঈশ্বর ভাবনার কোনো নিদর্শন তো প্রায় খুঁজেই পাই না। ঈশ্বর-ভাবনা থেকে তিনি পুরোপুরি সরে এসেছিলেনÑ এমন কথা বললে হয়তো বিতর্কের মুখে পড়তে হবে। তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি মানুষকেই তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন,Ñএ-কথা বললে যদি কেউ বিতর্ক জুড়ে দিতে চান, তা হলে সেটি হবে একান্তই কুতর্ক। জীবনের শেষ নববর্ষে ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক ভাষণে যে বললেন,Ñ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’Ñ সেটি অনাগত কালের মানুষের জন্যও বাঁচার মন্ত্র রূপে অক্ষয় হয়ে থাকবে।
পাঁচ
সারা জীবনভর তিনি বাঁচার মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন, সকলকে সেই মন্ত্র শিখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সৃষ্টি কর্ম বেঁচে থাকার মন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজে তিনি প্রবলভাবে গভীর ভাবে বেঁচে থেকেছেন। আমরাও তাঁর মন্ত্রদীক্ষিত হলে সে-রকম প্রবলতা ও গভীরতা নিয়েই বেঁচে থাকতে পারবো, কেউই আমরা ‘মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না।’
তবে মৃত্যুভয়ে ভীত থেকে কিংবা মৃত্যুকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে কিছুতেই বেঁচে থাকা যাবে না। কবি আমাদের স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়ে গেছেন
মৃত্যুকে যে এড়িয়ে চলে মৃত্যু তারেই টানে
মৃত্যু যারা বুক পেতে লয় বাঁচতে তারাই জানে।